৫ লাখ টাকার বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে জাল সনদ দিয়ে এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে নিয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি। অবাক করার মতো তথ্য হলেও তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম এলাকার জাহাঙ্গীর আলম ও আবেদা খাতুনের ছেলে জামাল নামে এক ব্যাক্তি। বাস্তবে তার নাম জামাল হলেও পুলিশের খাতায় যার নাম কামাল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালে স্থানীয় মুহাম্মদ আলী নামে এক দালালের মাধ্যমে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে যোগ দেন তিনি। সাম্প্রতিক টাইমস নিউজের এক অনুসন্ধানে এসব অবাক করা তথ্য উঠে এসেছে। যিনি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মেহেমান খানায়।
প্রশ্ন হল- ২০১৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে রাষ্ট্রের সাথে এমন প্রতারণা করে যে সব সুযোগ সুবিধা ও অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি তা কি আদৌ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে? সুযোগ সুবিধাগুলো হয়তো ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও রাষ্ট্রের যে অর্থ তিনি এতোদিনে অবৈধভাবে ভোগ করেছেন তা হয়তো সময়ের ব্যাবধানে রাষ্ট্র চাইলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এমন প্রতারকদেরকে রাষ্ট্র কি আদৌ আইনের আওতায় আনবেন? এমন অপরাধের জন্য রাষ্ট্র কি শাস্তি দেবেন তাকে? নাকি শুধুমাত্র চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েই দায় সারবেন কর্তৃপক্ষ!
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরী পেলেও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা নয়। মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষে নৃন্যতম কোন কাগজ নেই তাদের নিকট, যা তারা দেখাতে পারেন। এদিকে বিষয়গুলো নিয়ে টাইমস নিউজের একটি অনুসন্ধানী টিম কাজ শুরু করলে স্থানীয়রা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, আমরা আজকেই শুনলাম যে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা তো জানি ও দেখে আসতেছি তার বাবা একজন সাধারণত কৃষক মানুষ। কৃষি কাজ করে চলে। এছাড়া বিষয়গুলো নিয়ে জানতে ওই পুলিশ সদস্যের বাড়ীতে গেলে প্রথমে সবগুলো বিষয় নিয়ে পরিবারের লোকজন অস্বীকার করলেও পরক্ষণে শুধু মুক্তিযোদ্ধার সনদ যে ভূয়া তা টাইমস নিউজের অনুসন্ধানী টিমের নিকট নিশ্চিত করেন তার মা আবেদা খাতুন।
এদিকে অভিযুক্ত ওই পুলিশ সদস্যের বাড়ীতে সাংবাদিক যাওয়ার খবর পেয়ে ওই পুলিশ সদস্য বিষয়টি স্থানীয় এক সাংবাদিককে জানিয়ে দ্রুত রফাদফা করতে অনুরোধ জানান। এতে ওই ব্যাক্তি টাইমস নিউজের অনুসন্ধানী টিমকে ফোন দেন এবং বিষয়টি সমাধানের প্রস্তাব দেন। এতে অনুসন্ধানী টিম কোন ধরণের সাড়া না দেওয়ায় ওই ব্যাক্তি দুইদিন পর স্ব শরীরে টাইমস নিউজের অফিসে হাজির হয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য একের পর এক নানা ধরণের অনৈতিক প্রস্তাব দিতে থাকেন। এতে অনেকটাই বিরক্ত হয়ে বিষয়গুলো তার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানালে ওই ব্যাক্তি দ্রুত টাইমস নিউজের অফিস ত্যাগ করেন।
এদিকে অনুসন্ধানী টিম অভিযুক্ত সেই পুলিশ সদস্যদের জালিয়াতির সনদের কপি মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে রীতিমতো অবাক হয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মতো একটি জবাবদিহিতামূলক বাহিনীতে এমন নজিরবিহীন জালিয়াতি করে যোগদান করার সুযোগ থাকে তা হয়তো সাধারণ মানুষ কিছুতেই চিন্তা করতে পারে না। যাইহোক বিষয়গুলো নিয়ে অভিযুক্ত সেই পুলিশ সদস্যের সাথে সরাসরি কথা বলতে তার কর্মস্থল চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মেহেমান খানায় গেলে পরিচয় দিতেই যেন কলিজায় পানি শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম তার। কোন ক্ষতি হবে না তার এমন ভরসা দিয়ে চাকরী পাওয়ার পেছনের রহস্যময় গল্প জানতে চাইলে তিনি বলতে না চাইলেও যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক অবাক করা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
তিনি বলেন- ২০১৬ সালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল এলাকার মুহাম্মদ আলী নামে এক দালালের মাধ্যমে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি হয় তার বলে স্বীকার করেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সনদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান- মুহাম্মদ আলী নামে সেই দালাল সেটি তৈরী করে দিয়েছিলেন। যা ছিলো পুরোটাই জালিয়াতি বলেও তিনি স্বীকার করেন। আর ওই পুলিশ সদস্যদের নাম কি জানতে চাইলে তিনি জানান- তার নাম কামাল। এসময় সাংবাদিকরা জামাল কার নাম তা জানতে চাইলে তিনি সত্যতা স্বীকার করে বলেন- তার আসল নাম জামাল, কিন্তু তার কাগজে গড়মিল থাকায় জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি পরিবর্তন করে নিজেকে কামাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। আর নিজ এলাকায় সবাই তাকে জামাল হিসেবেই জানতো। অন্যদিকে চাকরীতে কার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ওই পুলিশ সদস্য বলেন- ভুল হয়েছে স্যার, এবারের মতো ক্ষমা করেন! আর কখনো এমন ভুল হবে না! এসময় অভিযুক্ত এই পুলিশ সদস্য বিষয়টি রফাদফা করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকদের ঘুষ দিতেও চেষ্টা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ হুমায়ুন কবিরকে সোমবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে ফোন দেওয়া হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
আর এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি)পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত আইজিপি পদোন্নতিপ্রাপ্ত) হাসিব আজিজকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।