নওগাঁর ধামইরহাটে হালিমা বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬), ভাইয়ের স্ত্রী হোসনে আরাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, সম্পদ ও স্বর্ণালংকারের প্রতি লোভ, পারিবারিক বিরোধ এবং মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে উপজেলার ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের বসতবাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেতের আইলে হালিমা বেগমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল পর্যবেক্ষণ করে। এ সময় তাঁর এক কানের লতি কাটা এবং অপর কানের লতি ছেঁড়া অবস্থায় দেখতে পায় পুলিশ।
এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর ধামইরহাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম এবং ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। তদন্ত ও স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রথমে মজনু রহমান ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার বস্তাবর গ্রামের রবিউল ইসলাম (৩৯) এবং ছিলিমপুর গ্রামের হামিদুর রহমান (৫৫) ও মোশারফ হোসেনকে (৪৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ দিন আগে এর পরিকল্পনা করা হয়। হালিমা বেগম ছিলেন নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্তা। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি বাবার বসতবাড়িতে ছোট ভাই মজনু রহমানের বাড়ির পেছনে টিনের ছাপড়ার একটি ছোট ঘরে বসবাস করতেন।
নিজের একটি গরু, তিনটি ছাগল এবং কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন করার পাশাপাশি অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তাঁর জমানো টাকা বড় ভাইয়ের ছেলে রুবেলের কাছে গচ্ছিত রাখতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, হালিমা তাঁর ছোট ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রীকে টাকা না দেওয়ায় তাঁদের মধ্যে মাঝেমধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতো। এ ছাড়া তাঁর গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও কানের স্বর্ণের দুলের প্রতি কয়েকজনের লোভ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার রবিউল ইসলাম এলাকায় মাদক বিক্রির উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে হালিমা বাধা দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে রবিউলের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের সঙ্গেও হালিমার পূর্ববিরোধ ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, এসব বিরোধ ও সম্পদের প্রতি লোভ থেকে মজনু রহমান ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরার পরিকল্পনায় পাঁচজন মিলে হালিমা বেগমকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের দাবি, ১৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর রহমান হালিমা বেগমকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে বের করেন। এরপর অন্যরা তাঁর মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যান।
সেখানে তাঁর হাত রশি দিয়ে বেঁধে গলা চেপে ধরে পরনের ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর হালিমার কানের দুল নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর এক কানের লতি কেটে এবং অপর কানের লতি ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে মরদেহটি সরিয়ে বাঁশঝাড়ের পাশে ফেলে রাখা হয়। এ সময় হাতের বাঁধন খুলে রশিটি ফেলে দেওয়া হয় এবং ওড়না দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে রাখা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতের কানের দুলের একটি মজনু রহমান এবং অন্যটি হামিদুর রহমান নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নওগাঁ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত পরিচালনা করে অল্প সময়ের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধ দমন, প্রতিরোধ এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, একজন বয়স্ক নারীকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা বলে জানা গেছে।