কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার শশীদল রেলস্টেশনে ট্রেনযোগে ভারতীয় চোরাই পণ্য ও মাদক পাচারের ভিডিও ধারণ করতে গেলে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল রেলস্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর রাতেই থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা হলেন- দৈনিক কালেরকণ্ঠের প্রতিনিধি আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয় এবং দৈনিক কুমিল্লা প্রতিদিন পত্রিকার প্রকাশক মো. শরিফুল ইসলাম সুমন।
অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামগামী ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেন স্টেশনে বিরতিকালে ট্রেনে ভারতীয় অবৈধ মালামাল ও মাদক ওঠানোর দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করার সময় কবির হোসেন, পারুল আক্তার, রাসেলসহ অজ্ঞাতনামা ১২-১৪ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
পরে সাংবাদিকরা মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় স্টেশনের বাইরে তাদের গতিরোধ করে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় এবং সংবাদ প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে। হামলায় আহত দুই সাংবাদিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শশীদল বিজিবি (বিওপি) ক্যাম্পের প্রায় ১০০ গজ দূরে অবস্থিত শশীদল রেলস্টেশন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চোরাই পণ্য ও মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ পণ্য এনে ট্রেনযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের সময় বিদ্যুৎ চলে যায় এবং ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার পর আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসে। এই সুযোগে অন্ধকারে ট্রেনে অবৈধ মালামাল তোলা হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন এবং একাধিকবার অভিযানও পরিচালনা করেন। তবে অভিযানের পরও ট্রেনযোগে চোরাই মালামাল পাচার বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবারও একইভাবে পাচার কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযানে চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও নেপথ্যের প্রভাবশালী গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এছাড়াও সাংবাদিকদের ওপর হামলার পাশাপাশি ট্রেনে অবৈধ মালামালের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে যাত্রীরাও একাধিকবার লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারিরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে বলেও জানা গেছে।
ঘটনার পর বিষয়টি শশীদল বিওপির কমান্ডারকে জানাতে গেলে সাংবাদিকরা দেখেন, শশীদল ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় হামলাকারীদের সঙ্গে কয়েকজন বিজিবি সদস্য অবস্থান করছেন। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও চোরাচালান প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে শশীদল রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবু তাহের সরকার বলেন, “স্টেশনে চোরাকারবারিদের কারণে আমাদের নিরাপত্তা নেই। ট্রেনে চোরাই পণ্য পাচারের কারণে যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবে উঠানামা করতে পারছেন না।” তিনি এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “হামলার ঘটনা শুনেছি। জনবল সংকট থাকলেও নিয়মিত অভিযান ও মামলা কার্যক্রম চলছে।” তিনি আরও জানান, শশীদল রেলস্টেশনে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক হোসেন বলেন, “ঘটনার পর রাতেই পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”