বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে বরগুনা সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম মিয়ার কাছে গিয়েছিলেন রাশেদুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক। কিন্তু তথ্য না দিয়ে উল্টো সাংবাদিককে হেনস্তা করে ইউএনও শামীম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এক আনসার সদস্য। পরে ইউএনও শামীম তার সরকারি গাড়িতে করে ফিল্মি স্টাইলে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে যায় থানায়। সেখানে তাকে ৯ ঘন্টা হাজতে আটকে রাখে ওসি আবুল কাসেম মো. মিজানুর রহমান। এ সময় সাংবাদিক রাশেদুলের মোবাইল ফোন জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে দুর্নীতির সকল প্রমাণ মুছে দেয় এসআই মো. সোহেল রানা এবং মুক্তির জন্য সাংবাদিকের কাছে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন তারা।
গত বছর ২৪ জুলাই দুপুরে ঘটে যাওয়া সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম। সোমবার বরগুনা আদালতে ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন তিনি। বরগুনার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শেখ আনিসুজ্জামান মামলাটি গ্রহণ করে পটুয়াখালী জেলা পিবিআই পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় আসামিরা হলেন- বরগুনা সদর উপজেলার সাবেক ইউএনও মো. শামীম মিয়া, বরগুনা সদর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কাসেম মো. মিজানুর রহমান, বরগুনা সদর উপজেলার সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান ও বরগুনা থানার এসআই মো. সোহেল রানা ।
মামলা সূত্রে জানা যায়, সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রার সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যান। এ সময় কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম মিয়ার কাছে মৌখিকভাবে তথ্য জানতে চান। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশেদুলকে কিছু তথ্য দিয়ে ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা প্রজেক্ট ইসপ্লিমেন্টেশন অফিসার মো. জিয়াউর রহমানের কাছে পাঠালে তিনি তাকে দুই দিন পরে যেতে বলেন। পরে নির্ধারিত দিনে আবারও তথ্যের জন্য অফিসে গেলে রাশেদুলকে ওই প্রকল্পের তথ্য দিতে তারা অস্বীকৃতি জানান। এছাড়া তাকে চাঁদাবাজীর কথা বলে পুলিশে দেওয়ারও হুমকি দেন। পরে অফিসে থাকা আনসার সদস্যের মাধ্যমে রাশেদুলকে সরকারি গাড়িতে উঠিয়ে বরগুনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় রাশেদুলকে ছেড়ে দিতে তার কাছে টাকা দাবি করা হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া আরও উল্লেখ করা হয়, বাদী রাশেদুলের কাছে থাকা প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির ডকুমেন্ট মুছে ফেলাসহ অভিযুক্তদের নিজস্ব লোকজনের মোবাইল ফোন থানা হাজতে আটকে রেখে তার ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক ভাবে রাশেদুলকে হেনস্থা করা হয়। পরে বরগুনা রিপোটার্স ইউনিট ও সংবাদিক ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক ও রাশেদুলের পরিবারের লোকজন থানায় এলে অভিযুক্ত আসামিদের লিখিত একটি মুচলেকায় স্বাক্ষর রেখে রাশেদুলকে তার মায়ের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
মামলার বাদী সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের আমলে এ সকল দুর্নীতিবাজরা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে তার উপর অন্যায়-অবিচার করেছে। সে সময় সাংবাদিক সমাজের শক্ত অবস্থানের কারণে ইউএনও এবং ওসি হাজতে আটকে রাখতে পারে নি। তার নিজের পৈতৃক জেলা থেকেই তাকে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর শামীম মিয়া। তবে সৃষ্টিকর্তার অপার করুনায় আদালতের দ্বারস্থ হতে পেরেছেন তিনি। এবার ন্যায় বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক রাশেদুল।
বাদী পক্ষের আইনজীবি এডভোকেট রাজিকুল ইসলাম আজম বলেন , পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত প্রতিটি প্রমাণ ও ঘটনার সময়ের অমানবিক ঘটনার ভিডিও দেখেছেন। এরপর শুনানী শেষে মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এদিকে শুধু সাংবাদিক রাশেদুলের কাছেই চাঁদা দাবি করে থেমে থাকেননি ইউএনও ও তার সহযোগী পিআইও জিয়াউর রহমান। বরগুনার প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার মনিরুজ্জামান মনিরের কাছ থেকে কাজের নামে ৪২ লাখ টাকা চাঁদা নেয়ারও তথ্য উঠে এসেছে। এরমধ্যে ৮ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে গ্রহণ করেছে চাঁদাবাজ কর্মকর্তারা। ঠিকাদার মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ইউএনও শামীম মিয়া ও পিআইও জিয়াউর রহমান আওয়ামীলীগের আমলে আমার কাছ থেকে ৪২ লাখ টাকা নিয়েছে। এর মধ্যে ৮ লাখ টাকা চেকের মাধ্যমে দিয়েছি। তারা কাজের টাকা নিজেদের অ্যাকাউন্টে রেখেছিল। প্রতিটি উন্নয়ন কাজের জন্য ঠিকাদাররা তাদের চাঁদা দিতে হতো। সাংবাদিকদের নাম ভাঙিয়েও টাকা নিয়েছে তারা। এবার আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।