নওগাঁ সদর উপজেলার শৈলগাছি ইউনিয়নের পারবাঁকাপুর গ্রামে কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে নিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে নির্যাতন ও ঘরছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে তাদের একমাত্র ছেলে, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার শেখ আঃ রহমান সাইকের বিরুদ্ধে।
সম্পত্তি আত্মসাৎ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং আদালতে মামলা চলমান থাকার মধ্যেই নতুন করে জমি হস্তান্তরের অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
চোখের জল মুছতে মুছতে বৃদ্ধা মঞ্জোয়ারা বেগম বলেন, “একমাত্র ছেলে। অনেক কষ্ট করে ঢাকায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছি। ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সে আমাদের দেখবে। আজ সেই ছেলেই আমাদের পথে বসিয়েছে। ঘরে মাত্র পাঁচ কেজি চাল আছে। কখনো একবেলা, কখনো না খেয়েই দিন কাটছে আমাদের।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী আব্দুল জলিল শেখ (৮৩) মূলত আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের তাড়াটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। পরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে নওগাঁ সদর উপজেলার পারবাঁকাপুর গ্রামে বসতি গড়ে তোলেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নার্সারি ব্যবসা করে তিনি প্রায় ২০-২৫ বিঘা জমির মালিক হন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছেলে শেখ আঃ রহমান সাইককে উচ্চশিক্ষিত করতে পরিবার অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। পরে নওগাঁ শহরে একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠাতেও সহায়তা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে বাবার সম্পত্তির দিকে নজর দেয় ছেলে— এমন অভিযোগ পরিবারের।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসার কথা বলে বাবার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন সাইক। টাকা দিতে না পারলে ব্যাংক ঋণের কথা বলে জমি বন্ধক রাখার অজুহাতে কৌশলে বাবার ১২ বিঘা এবং মায়ের ৬ বিঘা জমি নিজের নামে লিখে নেন তিনি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে বৃদ্ধ দম্পতি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালত এক পর্যায়ে তাদের পক্ষে একতরফা রায় দেন। তবে মামলা উচ্চ আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত ছেলে আবারও ওই সম্পত্তি তার স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। এছাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) জমির খারিজ বাতিল করে মূল হোল্ডিংয়ে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
বৃদ্ধ দম্পতির অভিযোগ, সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর থেকেই তাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পুত্রবধূ জিনাত জেবিন মুভির বিরুদ্ধে গালিগালাজের অভিযোগও করেন তারা। আব্দুল জলিল শেখের দাবি, ছেলে তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। এমনকি নাতি-নাতনিদের কাছ থেকেও তাদের দূরে রাখা হয়েছে।
বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ আব্দুল জলিল শেখ হাঁটাচলা করতে পারেন না। চিকিৎসকদের মতে, তার দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, যার ব্যয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। কিন্তু চিকিৎসা তো দূরের কথা, খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে এই দম্পতির।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনুপস্থিতিতে বাড়ির লোহার সিন্দুক কেটে জমির মূল দলিল, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যাংকের ব্ল্যাংক চেক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া বাবার নার্সারির গাছ, সুপারি বাগান, পুকুরের মাছ ও জমির ফসল বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলেও দাবি পরিবারের।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেখ আঃ রহমান সাইক। তিনি বলেন, “আমি বাবা-মাকে কোনো নির্যাতন করিনি। জমি নিয়ম মেনেই রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এখন অন্যের প্ররোচনায় তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন। আমি এখনও তাদের ভরণপোষণ দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা আমার কাছে থাকতে চান না।”
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য জালাল বলেন, “বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশ হয়েছে। ছেলে তার বাবা-মার ভরণপোষণ দিতে রাজি। তবে পারিবারিক বিরোধ ও জমিজমা নিয়ে জটিলতা রয়েছে।”
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতাতেই অভিযুক্ত ছেলে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। এমনকি লুট হওয়া চেক ব্যবহার করে বৃদ্ধ বাবার বিরুদ্ধে ‘চেক ডিজঅনার’ মামলা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তাদের।
শেষ বয়সে এসে অসহায় এই বৃদ্ধ দম্পতি প্রশাসনের কাছে চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে ডেইলি টাইমস নিউজের অফিস থেকে যোগাযোগ করা হলে নওগাঁ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন মাহমুদ ও নওগাঁ জেলা প্রশাসক (ডিসি) সাইফুল ইসলাম ঘটনার দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।