প্রথম পর্ব
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অবৈধ খাত থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মাদক ব্যবসা, চোরাকারবারি, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা চোরাই তেলের দোকান, পরিবহন সেক্টর, মাটি ব্যবসা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দু’পাশের অবৈধ হোটেল থেকে মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে ডেইলি টাইমস নিউজের অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে এবং পুরো বিষয়টি “ম্যানেজ” করতে স্থানীয় ২৫ সাংবাদিককে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়া হয়। অনুসন্ধানী টিমের হাতে এ সংক্রান্ত একাধিক তথ্য ও যোগাযোগের সূত্র এসেছে।
স্থানীয় সূত্র, ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং থানা পুলিশের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি থানার কয়েকজন নির্দিষ্ট সদস্যের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
অবৈধ হোটেল থেকে মাসিক লাখ লাখ টাকা আদায়: সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ হোটেল থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। এর মধ্যে সিমা হোটেল থেকে মাসিক ৩৫ হাজার টাকা, জোনাকি হোটেল থেকে ১ লাখ টাকা, বিসমিল্লাহ হোটেল থেকে ৫০ হাজার টাকা, সততা হোটেল থেকে ৩০ হাজার টাকা, ভূইয়া হোটেল থেকে ৫০ হাজার টাকা, রানার হোটেল থেকে ৩০ হাজার টাকা, কাসেমের হোটেল থেকে দেড় লাখ টাকা, চাপা সামিয়া থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং হোটেল বাধনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও মিয়াবাজার এলাকা থেকে পদুয়া বাজার রাস্তার মাথা পর্যন্ত মহাসড়কের দু’পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চোরাই তেলের দোকানগুলো থেকেও মাসিক মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, শুধু এসব দোকান থেকেই প্রতি মাসে অন্তত দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
“ম্যানেজমেন্ট” খাতে টাকা বণ্টনের অভিযোগ: থানার এক কনস্টেবল নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগের কিছু অংশের সত্যতা স্বীকার করে জানান, তেলের দোকানগুলো থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। তার দাবি, এই অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন খাতে বণ্টন করা হয়। এর মধ্যে মিয়ারবাজার হাইওয়ে থানাকে ২১ হাজার টাকা, থানার বাবুর্চিকে ৪ হাজার টাকা এবং ঝাড়ুদারকে ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি অর্থ বিভিন্নভাবে “ম্যানেজমেন্ট” কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানান তিনি।
একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি ও মাটি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন স্তরে পরিচালিত হয় চাঁদা সংগ্রহ:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চাঁদা সংগ্রহের প্রক্রিয়া তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়। থানার মুন্সি, ওসির বডিগার্ড এবং মেস ম্যানেজারের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে অর্থ সংগ্রহ ও সমন্বয় করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, আগের ওসির সময় বিভিন্ন লেনদেনে সক্রিয় ছিলেন তার বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত কনস্টেবল ইসমাইল। বর্তমান ওসির সময়ও তিনি একই দায়িত্বে বহাল থাকায় পুরো নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। একইভাবে, দীর্ঘদিন ধরে মুন্সির দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মাহবুব স্থানীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বক্তব্য নিতে গেলে নীরব ওসি: বুধবার (১৩ মে) বিকেলে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে চৌদ্দগ্রাম থানায় গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসাইন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি ক্যামেরার সামনেও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি তার বডিগার্ড কনস্টেবল ইসমাইলকে ডেকে সাংবাদিকদের বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করে রাখতে বলেন এবং পরে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেন।
থানা ছাড়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, চাওয়া হয় বিকাশ নম্বর: অনুসন্ধানী টিম থানা এলাকা ত্যাগ করার কিছুক্ষণ পর এক কনস্টেবল হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাদের অবস্থান জানতে চান। পরে প্রায় ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর আবার যোগাযোগ করে “ভুল হয়েছে” বলে দাবি করেন এবং সাংবাদিকরা আবার কবে থানায় যাবেন তা জানতে চান। একপর্যায়ে একটি বিকাশ নম্বর চাওয়া হয় এবং “ওসি সাহেব কিছু খরচ পাঠাতে বলেছেন” বলেও নিশ্চিত করেন ওই কনস্টেবল।
সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের দাবি: সচেতন মহলের দাবি, পুলিশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তারা বলছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে থানা পর্যায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, শুধু বদলি বা সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং দুর্নীতি ও মাসোহারা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না। পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অভিযোগ ধামাচাপা না দিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে জানতে সহকারী পুলিশ সুপার (চৌদ্দগ্রাম সার্কেল)-কে ফোন দেওয়া হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
“মাদক, চোরাকারবারি ও পরিবহন ঘিরে চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থাকছে দ্বিতীয় পর্বে”