নওগাঁ জেলার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল মডেল স্কুলের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, প্রতারণা, ভুয়া কাবিননামা, হুমকি ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বর্তমানে একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ফরহাদ হোসেনের বৈধ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তিনি স্কুলে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিভাবিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে যেসব অভিভাবিকার স্বামী প্রবাসে বা বাড়ির বাইরে থাকেন, তাদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ বাড়াতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালে এক অভিভাবিকার সঙ্গে ফরহাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারীর স্বামী প্রবাসে থাকায় তিনি সন্তানকে নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করতেন এবং ফরহাদ তার ছেলেকে বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। এক পর্যায়ে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্কুল কর্তৃপক্ষ গোপনে সমঝোতার মাধ্যমে ওই নারীকে তার সংসারে ফেরত পাঠায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ফরহাদ হোসেন ওই স্কুলের এক অফিস সহায়িকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভুয়া কাজী ও ভুয়া কাবিননামার মাধ্যমে বিয়ে করেন। দেনমোহর হিসেবে ছয় লাখ টাকা দেখিয়ে একটি ভুয়া জমির কাগজ উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী নারী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করেন। শুনানি শেষে প্রতারণা মামলায় ভুয়া কাজীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে ভুক্তভোগী নারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা করলে আদালত সার্বিক বিষয় বিবেচনায় কাবিন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী ফরহাদ ওই নারীকে কাবিন করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে দেনমোহর আদায়ে পারিবারিক আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলাগুলো চলমান থাকা অবস্থায় একদিন আদালত চত্বরে ফরহাদ ভুক্তভোগী নারীকে মারধর করেন এবং মামলা তুলে নিতে হুমকি দেন। এ ঘটনায় আবারও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
ভুক্তভোগীর দাবি, সম্প্রতি স্কুলের প্রিন্সিপাল আপস-মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে উভয়ের সংসার হবে বলে জানান। পরে ফরহাদ কয়েকবার তার বাড়িতে যাতায়াত করেন এবং সন্তান নিলে পরিবার মেনে নেবে বলে আশ্বাস দেন। এ সময় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয় এবং ওই নারী গর্ভবতী হন। তবে পরে ফরহাদ সংসার করতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বাধ্য হয়ে গর্ভপাত করান বলে অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক স্কুলে কর্মরত থাকার সুযোগ নিয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এক নারীর সঙ্গে পরিচয় থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্য এক নারীর বিষয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আপনাদের যা করার আছে তা করেন।”
ন্যাশনাল মডেল স্কুলের পরিচালক শহীদ প্রাং বলেন, ঘটনাগুলোর বিষয়ে তিনি অবগত আছেন এবং বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে সমাধান হয়নি।
এদিকে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেন এবং এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, “শিক্ষকতা অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক। আমরা চাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”