কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দায়ের করা এক মামলার প্রধান আসামির সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার প্রকাশ্য সখ্যতার অভিযোগ উঠেছে। সিসিটিভির একাধিক ফুটেজে এমন দৃশ্য ধরা পড়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে মামলার পর আসামি গ্রেপ্তার করার কথা পুলিশের, সেখানে তদন্ত কর্মকর্তার এমন আচরণ দায়িত্বহীনতা ও পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন তুলেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল ১১টা ৪২ মিনিটে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিএনজি থেকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রবীন দেব এবং মামলার ১ নম্বর আসামি আরিফুল ইসলাম পৃথক দিক থেকে নেমে একত্র হন। এ সময় এসআই প্রবীন দেবকে সাদা পোশাকে কোমরে ওয়্যারলেসসহ দেখা যায় এবং আসামি আরিফুল ইসলামকে কালো শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। পরে সকাল ১১টা ৫২ মিনিটে তারা একই গাড়িতে করে স্থান ত্যাগ করেন।
এ ঘটনায় মামলার তদন্তে চরম গাফিলতি, আসামি গ্রেপ্তারে নিষ্ক্রিয়তা, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রবীন দেবের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, বাদীকে হয়রানি এবং আসামিদের পক্ষে পক্ষপাতমূলক আচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, প্রতারণা, চুরি, বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ৭ মার্চ সাংবাদিক আবু বকর সিদ্দিক কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুইজনকে আসামি করে একটি এজাহার দায়ের করেন। ১২ মার্চ মামলাটি নিয়মিতভাবে রুজু হলেও দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
বাদীর অভিযোগ, ১৪ মার্চ তাকে আসামি ধরার কথা বলে গাড়ির ব্যবস্থা করতে বলা হয় তাকে। পরে তাকে ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয় এবং তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যক্তিগত ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফাকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। বরং উল্টো বাদীর ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী তদন্ত কর্মকর্তা ও ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে প্রতিকার চেয়ে পুলিশ সুপার বরাবর গত ২৯ মার্চ ও ৮ এপ্রিল লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও এখনো কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।
বাদী জানান, তদন্ত কর্মকর্তা প্রথমে আসামি গ্রেপ্তারের পরিকল্পনার কথা তাকে জানালেও পরে বিভিন্ন অজুহাতে তা এড়িয়ে যান। এমনকি ওসির নির্দেশনার পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের সদস্য। তারা নারী সদস্যদের মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তিদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে এবং পরে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায় করে। মামলার বাদীকেও একইভাবে টার্গেট করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে এক আসামির বিরুদ্ধে চাকরিরত অবস্থায় ল্যাপটপ ও প্রিন্টার চুরির অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের দাবি, এমন গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়েরের পরও পুলিশ আসামিকে আটক করে আদালতে সোপর্দ না করে উল্টো নিজেদের গাড়িতে করে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে দেয়। এতে তদন্ত কর্মকর্তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি, আসামির প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রমাণ নষ্টের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলার বাদীর দায়িত্ব তদন্তে সহযোগিতা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্ত পরিচালনা পুলিশের দায়িত্ব। সেই জায়গায় বাদীর কাছে সুবিধা চাওয়া, আর্থিক দাবি তোলা, তদন্তে গাফিলতি এবং আসামিদের সঙ্গে সখ্যতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে মামলাটি অন্য কোনো কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বাদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।