কুমিল্লার চান্দিনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর অটো গাড়ি চুরির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে থানার এসআই মিঠুন মন্ডল ও এসআই ইমামের বিরুদ্ধে। চুরির ঘটনায় স্থানীয় মাতাব্বররররা সমাধানে বসে সমাধান করতে না পারায় অভিযুক্তদের থানায় তুলে দিলেও রহস্যময়ভাবে কিছু সময়ের ব্যবধানে থানা থেকে অভিযুক্তদেরকে ছেড়ে দেন এসআই মিঠুন মন্ডল ও সে সময়ের ওসি নাজমুল হুদা।

এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ৮ জানুয়ারি পুলিশ সুপারের নিকট লিখিত অভিযোগ (১১৫/m) করেন ভুক্তভোগী পরিবার। এতে চান্দিনা থানা পুলিশকে তদন্ত করে দ্রুত রিপোর্ট দিতে নির্দেশনা দিলে তদন্তের ভার আসে আবারো সেই এসআই মিঠুন মন্ডলের কাধে। সেই রিপোর্ট সম্পকে বাদী বলছে তিনি কিছুই জানেন না। 
অন্যদিকে বিচার না পেয়ে ভুক্তভোগী পরিবার সাংবাদিকদের শরণাপন্ন হলে থানা পুলিশ ঘটনার ৩ মাস পর অর্থাৎ ৪ মার্চ মামলা নিতে বাধ্য হয়। এরপর দায়িত্ব ভার আসে থানার এসআই ইমামের কাধে। অভিযোগ রয়েছে, মামলা রুজু হওয়ার ৪২ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কোন আসামিকে গ্রেফতার না করে বা চোরাইকৃত কোন মালামাল উদ্ধার না করে উল্টো মামলার আসামিদের পক্ষ নিয়ে মামলার স্বাক্ষীদের নিকট সাদা কাগজে জবানবন্দী নিতে গত বুধবার বাদীকে চাপ দেন এসআই ইমাম। 
পুলিশের এমন কর্মকাণ্ডে বাদীর সন্দেহ হলে বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকদের জানালে এসআই ইমাম ক্ষিপ্ত হয়ে বাদীর সাথে অপেশাদার আচরণ করে নানান ধরণের হুমকি দেয়। অথচ গত ১০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার মামলার বাদীর বাসায় গিয়ে বাসা থেকে টেঁনে হিঁচরে বাইরে নিয়ে গিয়ে মারধর করেন এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেন আসামিরা। 
এ ঘটনায় মামলার স্বাক্ষী হওয়ার কারণে সবুজ নামে এক অটো চালকের গাড়ি আসামিদের সহায়তায় সালাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি রবিবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে কেড়ে নিয়ে মারধর করে চুরির অপবাদ দিয়ে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাপ দেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সবুজ তাৎক্ষনিকভাবে থানায় গিয়ে আইনগত সহায়তা চাইলে তিনি কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় সন্ধা ৭টার সময় উপজেলা হসপিটালের সংলগ্ন এলাকায় নিজ গায়ে পেট্রোল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন সেই ভুক্তভোগী অটো চালক। এ ঘটনায় চান্দিনা উপজেলা মেডিকেল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে রোগীর অবস্থা অবনতি হলে ঢাকা জাতীয় বার্ন ইউনিটিতে নেওয়া হয় তাকে। মৃত্যুর পথযাত্রী আহত মোঃ সবুজ চান্দিনা উপজেলার বাড়েরা ইউনিয়নের গড়ামারা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে। সে চান্দিনা উপজেলা সদরের বেলাশ্বর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে ব্যাটারি চালিত অটো গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। 
মামলা সূত্রে জানা যায়, চান্দিনা হাসপাতাল রোডের ইউনুছ মিয়ার অটোরিক্সার গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে ভুক্তভোগী সবুজ, আবুল হাশেম ও সালাউদ্দিন নামে ৩ জন ওই গ্যারেজে তাদের অটোরিক্সাগুলো রাখেন। পালাক্রমে তারা তিনজন পাহারাও দেন। প্রায় ৪ মাস পূর্বে অথাৎ গত বছরের ৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাহারার দায়িত্ব ছিল অটো চালক আবুল হাশেমের। ওই রাত সাড়ে ৩টার দিকে শারিরীক অসুস্থতার কারণে গ্যারেজে তালা দিয়ে আবুল হাশেম ঘুমাতে বাসায় চলে যায়। এ সময় চোরচক্র আবুল হাশেম ও সালাউদ্দিনের ২টি অটো গাড়ি নিয়ে যায়। ঘটনার সময় গভীর রাতে আশেপাশে মানিক নামে এক ব্যক্তিকে দেখে সন্দেহ হলে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে চুরির ঘটনা স্বীকার করে নাজমুল ও সাইফুলসহ আরও ৮-১০জন জড়িত থাকার কথা জানায়। এতে স্থানীয় মাতাব্বররা সমাধানে বসলে মানিক ও সাইফুল স্বীকার করলেও নাজমুল স্বীকার না করায় সমাধান হয়নি। ফলে স্থানীয় মাতাব্বররা চুরির দায়ে মানিক, নাজমুল ও সাইফুলকে জড়িত থাকার অভিযোগে থানায় সোপর্দ করে। 
পরে স্থানীয় বাদল নামে এক কথিত দালাল বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধান করবেন বলে থানা থেকে নিজ জিম্মায় ছাড়িয়ে নিয়ে যান তাদেরকে। পরে বিষয়টি কোন সমাধান না করে যেহেতু ঘটনার দিন আবুল হাশেম ডিউটিতে ছিলেন, তাই তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে সালাউদ্দিনের ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে চাপ দেন এই কথিত দালাল বাদল। যদিও ঘটনার দিন শুধু সালাউদ্দিনের গাড়িই নয়ই, আবুল হাশেমেরও গাড়ি চুরি হয় সে সময় সেখান থেকে। এ ঘটনায় বিষয়টি প্রতিকার চেয়ে ৮ জানুয়ারি জেলা পুলিশ সুপারের নিকট লিখিত অভিযোগ (নং- ১১৫/M ) দিলে তা চান্দিনা থানা পুলিশকে তদন্ত করে দ্রুত রিপোর্ট দিতে নির্দেশনা দেন জেলা পুলিশ সুপার। অথচ এ বিষয়ে এসআই মিঠুন মন্ডল তদন্ত করলেও তা আদৌ এ বিষয়ে কিছুই জানে না খোদ বাদীই। 
এদিকে পুলিশ সুপারের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন ধরণের প্রতিকার না পাওয়ায় ভুক্তভোগী আবুল হাশেম টাইমস নিউজকে বিষয়টি জানায়। এতে ঘটনার প্রায় তিন মাস পর থানা পুলিশ চুরির মামলা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে ভুক্তভোগী আবুল হাশেমের স্ত্রী বাদী হয়ে ৪ মার্চ চান্দিনা থানাধীন বেলাশ্বর গ্রামের মোহাম্মাদ আলীর ছেলে মানিক (২০), নাজমা বেগমের ছেলে নাজমুল (২৫) ও তাজেল মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলাম (২০) সহ অজ্ঞাতনামা ৮-১০জনকে আসামি করে চুরির মামলা দায়ের করেন।
এ বিষয়ে আহত অটো চালক সবুজের স্ত্রী খুশি আক্তার জানান- গরীবের জন্য আইন নাই! বিচার নাই! তারা (মাতাব্বররা) চোর ধরে ছেড়ে দিছে। আর আমার স্বামীরে চুরির অপবাদ দিয়ে জরিমানা করে! আমার স্বামী এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজের গাঁয়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
এ বিষয়ে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাবেদ উল ইসলাম জানান- অটো চুরির ঘটনায় সে সময়ে মানিক, সাইফুল ও নাজমুল নামে তিনজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা হয়। ওই চুরির ঘটনায় সবুজকে দায়ী করে চাপ সৃষ্টি করলে সে অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের গায়ে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।