নদীতে উত্তোলনযোগ্য বালু না থাকায় চলতি অর্থবছরে ইজারা বন্ধ থাকলেও নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় আত্রাই নদী ও আশপাশের এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বালু ও লাল মাটি লুটের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খোদ প্রশাসনের দেওয়া ভূয়া অনুমোদনপত্র ব্যবহার করে প্রভাবশালী বালুদস্যুরা ফসলি জমি ও সরকারি মাঠ থেকে বালু অপসারণের নামে অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে।
স্থানীয়রা জানান, ফ্যাসিবাদী আমলে দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে আত্রাই নদী কার্যত বালুশূন্য হয়ে পড়ে। তবুও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের একটি অংশ ‘উত্তোলনযোগ্য বালু আছে’—এমন ভূয়া সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করে বছরের পর বছর নামমাত্র মূল্যে বালুমহাল ইজারা দিয়ে এসেছে। নদীর উপরিভাগে বালু না পেয়ে ইজারাদাররা আইন অমান্য করে বলগেট ড্রেজার বসিয়ে ভূগর্ভস্থ বালু ও লাল মাটি উত্তোলন করে।
গত বছর মহাদেবপুর দর্পণ পরিবারের নেতৃত্বে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর আত্রাই নদীর বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারা বন্ধ থাকলেও গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে শতাধিক নতুন পয়েন্ট তৈরি করে অবৈধ ড্রেজার ও ভেক্যু মেশিন বসিয়ে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হয়েছে। ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও আজও নানা কৌশলে সেই উত্তোলন ও পরিবহণ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতি রাতেই উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ভেক্যু মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ড্রাম ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিবহণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের মুর্শিদা–সুলতানপুর–নুরপুর মৌজায় প্রকাশ্য দিবালোকে ভেক্যু মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে পরিবহণের চেষ্টা করলে স্থানীয়রা বাধা দেন। এ সময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত একাধিক মেশিন তারা আটক করে রাখেন।
ঘটনাস্থলে থাকা একটি ট্রাক্টরের চালক সাংবাদিকদের জানান, মহাদেবপুরের বিএনপি নেতা হাজী আক্কাসের গাড়িতে করে বালু পরিবহণ করা হচ্ছে। তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের স্বাক্ষরিত একটি অনুমতিপত্র দেখান।
ওই অনুমতিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, হাতুড় ইউনিয়নের বিএনপি নেতা আব্দুল জলিল ও জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেছেন—নুরপুর মৌজার ৬৬ নম্বর খতিয়ানের ৪২৯ দাগের জমিতে আগের ইজারাদার নদী থেকে উত্তোলিত বালু রেখে গেছে। ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও জমির ওপর পড়ে থাকা বালু অপসারণ না করলে ফসল আবাদ সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষিতে গত ৯ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান জমি আবাদযোগ্য করার শর্তে বালু সরানোর অনুমোদন দেন এবং মূল জমি খনন না করার নির্দেশনা দেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, যেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সেটি আবেদনকারীদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের খেলার জন্য ব্যবহৃত একটি সরকারি মাঠ। এখানেই আগের ইজারাদার অবৈধভাবে বালু স্তূপ করে রেখেছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান অনুমোদন দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এর আগেও এ ধরনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ডকেট যাচাই করে এনায়েতপুর–হাতুড় ইউনিয়নের ভূমি কর্মকর্তা মওদুদুর রহমান কল্লোল নিশ্চিত করেন, আবেদনে উল্লেখ করা তফসিলটি সম্পূর্ণ ভূয়া। তিনি বলেন, নুরপুর মৌজার ৬৬ নম্বর খতিয়ান আবেদনকারীদের নামে নয়; এটি জিতেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নামে। পাশাপাশি ওই খতিয়ানে ৪২৯ নম্বরের কোনো দাগই নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চলতি শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কয়েক মাসে ভূয়া তফসিল দেখিয়ে প্রশাসনকে ভুল বুঝিয়ে ‘বালু অপসারণের’ নামে আত্রাই নদী থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার বালু চুরি করে বিক্রি করা হয়েছে। জেনেশুনেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি অংশ এসব ভূয়া আবেদনে অনুমোদন দিয়ে সরকারি সম্পদ লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। এ ঘটনায় অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।