কুমিল্লার চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত আইসি সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে সাংবাদিকদের সরাসরি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দৈনিক মুক্ত খবর, দৈনিক অপরাধের শিরোনাম ও টাইমস নিউজ-এ “চাঁদার টাকায় উপঢৌকন! কুমিল্লার চকবাজারে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে পুলিশের চাঁদাবাজি” শিরোনামে প্রথম পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্বিতীয় পর্বের নিউজের বক্তব্য নিতে গেলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখে পড়েন সাংবাদিকরা।
গত ২৭ জানুয়ারি বিকেলে কয়েকজন সাংবাদিক চকবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে অভিযোগ রয়েছে, এসআই সুমন মিয়া তাদের হাতে ঘুষের খাম তুলে দিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে একাধিকবার ফোন করে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
এদিকে চকবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী এএসআই সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজকে ঘিরেও রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্টের পর একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বদলি হলেও রহস্যজনকভাবে তিনি ফাঁড়িতেই বহাল থাকেন। টানা দুই বছরের বেশি সময় একই ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের সঙ্গে সখ্যতা, অর্থ লেনদেন, আটক বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ মহলেও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগে ব্রাহ্মণপাড়া থানায় কর্মরত থাকাকালে এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মারধরের ঘটনায় এএসআই সিরাজ গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়েন। ওই ঘটনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দেড় লক্ষ টাকার বিনিময়ে অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সে সময় তাকে কেবল নামমাত্র অন্যত্র বদলির সুপারিশ করা হয় বলেও দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজের বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এছাড়াও কুমিল্লা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাইফুল মালিকের বিরুদ্ধে অধীনস্থ থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ডজনখানেক সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা টাইমস নিউজকে জানান, আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা, নানাভাবে হুমকি প্রদান, মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে দেখা করার জন্যও চাপ প্রয়োগ করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জন্য মানসিক ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, চকবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ইন্সপেক্টর পদায়ন না থাকার সুযোগ এবং কোতোয়ালি মডেল থানায় নবাগত ওসির পদায়নের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সদর সার্কেল কার্যত ফাঁড়িটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফাঁড়িতে সংঘটিত প্রতিটি কার্যক্রমই তার নির্দেশনা ও ইশারাতেই পরিচালিত হচ্ছে।
এ তালিকায় কোতোয়ালি মডেল থানার কয়েকজন অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার নামও উঠে এসেছে, যাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে অদৃশ্য একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেই চাপা উত্তেজনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ২৮ জানুয়ারি কুমিল্লা সদর সার্কেলের কার্যালয়ে গেলে সহকারী পুলিশ সুপার বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। যা বলার পুলিশ সুপার বলবেন।”
ঘটনার পর পুলিশের দায়িত্বশীল মহলের নীরবতা ও স্পষ্ট বক্তব্যের অভাব নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—দেশে সাংবাদিকের স্বাধীনতা ও পুলিশি স্বচ্ছতা আদৌ কতটা সুরক্ষিত?
সাংবাদিকদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এবং পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে সিন্ডিকেট ও প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়গুলোকে গভীর উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “সংবাদ থামাতে ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া শুধু ফৌজদারি অপরাধই নয়ই, এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীনভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং তদন্তকালীন সময়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সংযুক্ত বা প্রত্যাহার করা অত্যান্ত জরুরি। তা না হলে প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ে সত্য চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে ওঠা এতগুলো গুরুতর অভিযোগের আদৌ কি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হবে? নাকি আগের মতোই নীরবতা ও অদৃশ্য প্রভাবের আড়ালে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে?