কুমিল্লায় মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে নামমাত্র কয়েকবার অভিযান চালিয়ে ঝিমিয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে জেলা প্রশাসনের। জেলার আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলা নিয়ে প্রায় ১০৬ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে গোমতী নদী। লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, লালমাই ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নিয়ে প্রায় ১১৩ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ডাকাতিয়া নদী। এছাড়াও গুঙ্গাইজুরী, কার্জন, বুড়ি, গুনু, ঘুঙ্গুর, পাগলী, কাঁকড়ী, কাঠালিয়া, কালাডুমুর, ক্ষিরাই, মেঘনা আপার, তিতাস, মধুকুপি, আরচি, পুরাতন ডাকাতিয়া, মাইঠ্যা, তিতাস, শুভানগর, সোনাইছড়ি ও বোয়ালজুরী নামে অন্তত ২২টি নদী রয়েছে জেলার বিভিন্ন উপজেলা জুড়ে। যার অধিকাংশ নদীতেই রাতের আধারে মাটি খেকোদের রমরমা বাণিজ্য চলছেই। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলাধীন ফসলি জমির মাটি, পুকুর খনন ও পাহাড়ের মাটি কাটা তো দিনের ও রাতের অংশ। 
গত রবিবার (৯ মাচ) কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গোমতী নদীর মাটি কাটার বিষয়ে ঘুমন্ত এক দপ্তরকে নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। এতে কোন ফলাফলই হয়নি। একদিকে গোমতী নদীতে রাতের আধারে মাটি কাটার মহৌউৎসব। আরেকদিকে গোমতীর দুই ধারে দখল করে নামে বেনামে বিভিন্ন কফি হাউজ, পার্ক, রেস্টুরেন্ট, চা দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরীর এক প্রতিযোগিতার হিড়িক চলছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এসব আড্ডাখানাকে ঘিরে নানা ধরণের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এসব এলাকায়। আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গোমতি নদীর বাঁধে ট্রাক উঠা নামার র্যামগুলো কেটে দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েকটি নদীর বাঁধে ট্রাক উঠা নামার র্যামগুলো কেটে দিলেও কোনই লাভ হয়নি। আগের মতোই মাটি খেকোদের তৎপরতা রয়েছেই। এ তো গেলো গোমতী নদীর কথা! জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরও ২১টি নদীর কি অবস্থা? আর নদী ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার ফসলি মাটি, পুকুর কাটা ও পাহাড় কাটার কি অবস্থা? সেই দিকে কি কোন নজর আছে প্রশাসনের! 
এসব ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ব্যর্থতা ও গাফিলতি বা উদাসিনতাকেই দায়ী করছেন সচেতন মহল। তাদের দাবি- অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারী জড়িত থাকাকে দায়ি করছেন তারা। বালু মহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এ এবিষয়ে সু-স্পষ্ট করে বলা রয়েছে। এছাড়াও আইনটিতে ২০২৩ সালে সংশোধনীর ৭ (ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, (খ) ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির বালু বা মাটি হলেও তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনভাবেই খনন করতে পারবেন না। (ঘ) পরিবেশ বা জীববৈচিত্রের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। এই আইনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে নিজ মালিকানাধীন ভূমি থেকে সীমিত পরিসরে বালু বা মাটি উত্তোলন করতে পারবেন বলে বলা হয়েছে। অথচ এমন আইনের তোয়াক্কা না করে মাটি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জায়গার মালিককে লোভ দেখিয়ে জায়গার মালিককে দিয়েই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত আবেদন করান। পরে তা শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হলেও পরের খবরটুকু কি রাখেন অনুমোদনকারী সেই কর্মকর্তা? মাটি ব্যবসায়ীরা এমন অনুমতি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবেই শুরু করেন মাটি কাটার প্রতিযোগিতায়। একদিকে অনুমোদন নিয়ে আইনের সঙ্গে প্রতারণা, আরেকদিকে সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিভিন্ন ভাবে বিঘ্ন বা বাঁধা সৃষ্টি করে জনদুভোগ সৃষ্টি করেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, কোন কোন এলাকায় পাঁকা সড়ক ভেঙ্গে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে এমন কান্ডে। 
এই আইনে শাস্তি স্বরূপ বলা হয়েছে যে, এ আইন বা অন্য কোন বিধান লঙ্ঘন করে অথবা বালু বা মাটি উত্তোলনের জন্য বিশেষভাবে ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বালু বা মাটি উত্তোলন করিলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ বা তাহাদের সহায়তাকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণকে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা হইতে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করাত বিধান রয়েছে। এছাড়াও উক্ত অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালু বা মাটিবাহী যানবাহন বা সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে এই আইনে। সচেতন মহলের দাবি- আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে ও সবুজে শ্যামলে ভরা একটি সুন্দর বসবাসযোগ্য কুমিল্লাকে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসনকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় মূল হোতা পলাতক থাকলেও অপরাধ সংঘটিত করার সময় সহায়তাকারীকে আটকের পর তার স্বীকারোক্তমূলক জবাবন্দি দিয়ে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদেরকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বনিন্ম অর্থদণ্ডের পরিবর্তে সর্বচ্চো অর্থদণ্ডের আওতায় আনতে তাগিদ দিচ্ছেন অনেকেই। 
কুমিল্লা জেলা জুড়ে অন্তত ৩ হাজারের অধিক ইটভাটা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তালকা অনুযায়ী কুমিল্লা জেলায় ১২৪টি ইট ভাটার বৈধতা রয়েছে বলে জানা গেছে। তারমধ্যে আদর্শ সদর উপজেলায়- ১১টি, সদর দক্ষিণ উপজেলায়- ৯টি, লালমাই উপজেলায়- ৩টি, চৌদ্দগ্রাম উপজেলায়- ৩১টি, মুরাদনগর উপজেলায়- ১৫টি, নাঙ্গলকোট উপজেলায়- ১১টি, লাকশাম উপজেলায়- ৫টি, মনোহরগঞ্জ উপজেলায়- ২টি, দেবিদ্বার উপজেলায়- ৫টি, বুড়িচং উপজেলায়- ৬টি, চান্দিনা উপজেলায়- ৯টি, বরুড়া উপজেলায়- ৭টি, দাউদকান্দি উপজেলায়- ৩টি, তিতাস উপজেলায়- ৫টি ও মেঘনা উপজেলায়- ১টি ইট ভাটার অনুমোদন রয়েছে। যদিও মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে অবৈধ ইট ভাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ছাড়াই নিয়ম না মেনে কৃষিজমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ইট ভাটার কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। আইনের তোয়াক্কা না করে এসব ফসলি জমিতে ইটভাটা গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া বসতবাড়ির আশপাশেও ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসল ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিচ্ছে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে ও সবুজে শ্যামলে ভরা একটি বাসযোগ্য কুমিল্লাকে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে পরামর্শ দিচ্ছেন সমাজের অনেক সু-নাগরিকরা। 
গোমতী নদীর মাটি খেকোদের তৎপরতা রুখতে তাদের বিষয়ে এবং নদীর দুই ধারে অবৈধভাবে গড়ে তোলা বিভিন্ন স্থাপনার বিষয়ে কোন ধরণের পদক্ষেপ কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুমিল্লা পূর্বাঞ্চল’র (বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহারিয়ার কোন সঠিক জবাব দিতে পারেননি। তবে তার দাবি- এ বিষয়ে সরকারী ভাবে কোন বাজেট না আসা পর্যন্ত গোমতী নদীতে আপাতত অভিযান চালানো সম্ভব নয়ই।