জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ২৯ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বদলি ও নতুন করে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে এই সাম্প্রতিক পদায়নকে ঘিরে প্রশাসনে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে—গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কিংবা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কম থাকা কর্মকর্তাদের। এতে মাঠ প্রশাসনে নিরপেক্ষতা, আস্থাহীনতা এবং নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তত ১০–১২ জন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি পদে নিয়োগ পেয়েছেন। পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অন্তত তিনজন ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে—যা অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান সম্বলিত ভিডিও ভাইরাল হওয়া উপসচিব আজাদ জাহানকে নতুন করে গাজীপুরের ডিসি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক অনিয়ম ও ভূমি দখলের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সময়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ জেলায় তাকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
একইভাবে, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের ছবি-সংবলিত পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা উপসচিব আফসানা বিলকিসকে মাদারীপুরের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয় আনুগত্যের প্রকাশ্য প্রদর্শনের কারণে তার পদায়নকে কেন্দ্র করেও সমালোচনা দেখা গেছে।
অন্যদিকে, নড়াইলের সাবেক ডিসি শারমিন আক্তার জাহানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি করা হয়েছে। অতীতে আর্থিক অনিয়ম ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যুর অভিযোগ নিয়ে আলোচনায় থাকা এ কর্মকর্তা পদোন্নতির পর ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে শপথ’ নেওয়ায় আরও বিতর্কে আসেন।
ময়মনসিংহের নতুন ডিসি সাইফুর রহমান, মানিকগঞ্জের ডিসি নাজমুন আরা সুলতানা এবং আরও কয়েকজন ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা—যাদের মাঠ প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতা সীমিত—তাদের পদায়ন প্রশ্ন তুলছে প্রশাসনের দক্ষতা ও বঞ্চনা-সংক্রান্ত আলোচনায়।
একইভাবে, বাগেরহাটের সাবেক ডিসি আহমেদ কামরুল হাসানকে নোয়াখালীর ডিসি করা হয়েছে—তারও মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম।
২০১৪ সালের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার (এআরও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সন্দীপ কুমার সিংহ (বরগুনা) ও লুত্ফুন নাহার (মেহেরপুর) এবারও ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচনি অনিয়ম–সংক্রান্ত অভিযোগ অতীতে উত্থাপিত হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মোখলেসুর রহমানের সময় থেকেই ডিসি নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও বঞ্চনার অভিযোগ চলে আসছে। এবারের পদায়নকে অনেকেই সেই বিতর্কেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন।