জীবনে রাতের অন্ধকার দূর করতে একটা সময় মানুষের অন্যতম ভরসা ছিল হারিকেন। জীবন বড় অদ্ভুত ছুটে চলে ঠিকানায় অঠিকানায়। সময় চলে তার নিজস্ব গতিতে। ছোট্ট এই জীবনে সময়ের সাথে হারিয়ে যায় অনেক কিছু ঐতিহ্য আর ইতিহাস হয়ে থেকে যায় যুগের পর যুগ।আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারানো ঐতিহ্য হারিকেন এখন শুধুই অতীত। মলাট বদ্ধ হয়ে ইতিহাস বহন করছে এবং করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। জীবন যাত্রার আধুনিকায়ন, তথ্য প্রযুক্তি, বিদ্যুতের সহজলভ্যতা ও জ্বালানি তৈল কেরোসিনের দাম বাড়ার ফলে বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য হারিকেন বাতি।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার নানা পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই পড়ালেখা করেছেন হারিকেনের মৃদু আলোয়। গৃহস্থলি এবং ব্যবসার কাজেও হারিকেনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। তবে এখন সেই হারিকেন অত্যন্ত অবহেলাসহ ঠাঁই পেয়েছে জাদুঘরে। হারিকেনের স্থান দখল করেছে নানা ধরনের আধুনিক বৈদ্যুতিক বাতি।
শত বছর বয়সী আলহাজ্ব মো.ওমর আলী মাস্টার বলেন, আমাদের সময় পড়াশুনার জন্য একমাত্র অবলম্বন ছিল হারিকেন আর কুপি বাতি। তাছাড়া, হারিকেন জ্বালিয়ে রাতে হাট-বাজারে যেতাম আমরা। দোকানিরাও বেচাকেনা করত হারিকেনের আলোতে। তবে এখন এলাকায় বিদ্যুতের প্রভাব ও কেরোসিন তৈলের দাম বাড়ার কারণে আর হারিকেন ব্যবহার হয় না। তবে আমাদের বাড়িতে হারিকেন এখনও আছে।
আব্দুর রহিম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের তৈলের ব্যবসা ছিল। উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে দিনের শুরু থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত কেনা বেচা চলতো। সেই সময় আমরা হারিকেন জ্বালিয়ে বাজারে ব্যবসা করেছি। তবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা হওয়ায় হারিকেন বাদ দিয়ে দিয়েছি। বিদ্যুৎ আসায় আমাদের বাড়িতেও এখন আর হারিকেন ব্যবহার হয় না। তবে হারিকেন একটি সময়ে আমাদের খুব উপকার করেছে। শহর বা গ্রামে এখন আর হারিকেন ব্যবহার হয় না।
বর্তমানে হারিকেনের ব্যবহার নাই বললেই চলে। হারিকেন জাপানি শব্দ হলেও প্রাচীন বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য কুপি বাতি, মোমবাতি ও হারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। গ্রামের অমাবস্যার রাতে মিট-মিট আলো জ্বালিয়ে মানুষের পথ চলার স্মৃতি এখনও তাড়া করে। দিন দিন প্রযুক্তি মানুষকে উন্নত করছে। হারিকেন ছেড়ে মানুষ এখন বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎসহ জ্বালানি খাতে ব্যাপক উন্নয়নে ঐতিহ্যবাহী হারিকেন বিলুপ্তির পথে। এছাড়াও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকে সংগ্রহ করে ব্যবহারের পন্থা আবিস্কার করেছে বিজ্ঞানীরা। চার্জলাইট, সৌরবিদ্যুৎসহ বেশকিছু আলোর জোগান থাকায় এখন আর কেউই ঝুঁকছেন না হারিকেনের দিকে।
প্রবীণ ব্যক্তি আলহাজ্ব মো.আব্দুল মালেক মোল্লা হারিকেন সম্পর্কে বলেন- তৈল গেলে ফুরাইয়া, বাতি যায় নিভিয়া, কি হবে আর কান্দিয়া! কবির ভাষায় এখন হারিকেন শব্দটি অতীত। বর্তমানে তৈল থাকলে ও নেই হারিকেন, কালের অবর্তে হারিয়ে গেছে নিভু নিভু করেও আর জ্বলে না হারিকেন নামে অন্ধকারে আলো ছড়ানো বস্তুটি।এক সময় হারিকেন দেখতে যেতে হবে জাদুঘরে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেও না হারিকেন কী বা হারিকেনের ইতিহাস! চায়না জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খুব দ্রুত চার্জ সংরক্ষণকারী আলোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। এভাবেই হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারিকেন বাতি।