1. admin@timesnews24.live : admin :
সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫ এসি স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, জরিমানা ৯৫ হাজার টাকা ৩২ বছর মানুষের হাতে খবর তুলে দিয়েছেন, আজ নিজেই খবরের শিরোনাম নিতাই সাহা গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপিয়ে দেশের চলমান সংকট নিরসন করা সম্ভব নয় চৌদ্দগ্রামে জমি দখল, বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুরের প্রতিবাদে ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন বুড়িচংয়ে বৃদ্ধাকে নৃশংস হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিচারের দাবি কুমিল্লায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিভিল সার্জনের মতবিনিময় নওগাঁয় বৃদ্ধা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিল জেলা পুলিশ, ছোট ভাই-ভাবিসহ গ্রেপ্তার ৫ সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার প্রতিবাদে কুমিল্লায় মানববন্ধন চৌদ্দগ্রামে খেঁয়াইশ দারিদ্র্য বিমোচন সংগঠনের উদ্যোগে ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত লটারির আড়ালে ‘বদলি-বাণিজ্যের’ অভিযোগ: জাগৃকের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের পদায়নে ক্ষোভ

প্রযুক্তির যুগেও থামেনি পিতলের ইস্ত্রি, আত্রাইয়ে বাবলু সাহার সংগ্রামের গল্প

এমরান মাহমুদ (আত্রাই প্রতিনিধি)
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১২ বার পঠিত

আত্রাইয়ের বান্দাইখাড়া বাজারের ছোট্ট এক দোকান। টেবিলের পাশে স্তূপ করে রাখা কয়লা। আগুন জ্বালিয়ে সেই কয়লা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় পিতলের পুরোনো এক ইস্ত্রির ভেতর। তারপর ধোঁয়া আর তাপের ভেতর ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে ওঠে কাপড়। এ দৃশ্য আজকের দিনে অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। কিন্তু নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া এলাকার বাবলু সাহা প্রভাতের কাছে এটাই জীবন, এটাই জীবিকা।

৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কয়লার ইস্ত্রি দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করে চলেছেন তিনি। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, বাজারে এসেছে বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি আর আধুনিক লন্ড্রি সেবা। কিন্তু বাবলু সাহা প্রভাতের হাতের সেই পুরোনো পিতলের ইস্ত্রি এখনও থেমে যায়নি।

বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী বাবলু সাহা প্রভাত জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৯-১০ বছর পরের কথা। তখন তিনি ছিলেন তরুণ। গ্রামে বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। শখের বশে ভারত ভ্রমণে গিয়ে ২০০ টাকায় একটি পিতলের কয়লার ইস্ত্রি কিনে আনেন। সেই ইস্ত্রিই হয়ে ওঠে তার জীবনের মোড় ঘোরানো সঙ্গী।

“নির্দিষ্ট সালটা এখন আর মনে নেই। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর ইন্ডিয়া বেড়াতে গিয়ে ২০০ টাকায় ইস্ত্রিটা কিনে আনি। এরপর থেকেই বান্দাইখাড়া বাজারে কাপড় ইস্ত্রির কাজ শুরু করি,” বলেন বাবলু সাহা প্রভাত।

শুরুটা অবশ্য সহজ ছিল না। তখন নিজের দোকানও ছিল না। বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনে মানুষের কাছে একটু জায়গা চেয়ে নিয়ে বসতেন। সেখানেই চলত ইস্ত্রির কাজ। পরে ধীরে ধীরে একটি ছোট দোকান ভাড়া নিয়ে স্থায়ীভাবে বসেন। একসময় ইস্ত্রির পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজও করতেন। তবে এখন বয়সের ভারে সেলাইয়ের কাজ ছেড়ে দিয়ে শুধু কাপড় ইস্ত্রির কাজই চালিয়ে যাচ্ছেন।

বান্দাইখাড়া বাজারের ভেতরে তার ছোট্ট দোকানটিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক টুকরো অন্যরকম সময়। একদিকে কাঠের টেবিল, অন্যদিকে দেওয়াল ঘেঁষে রাখা কয়লার স্তুপ। সেই কয়লার আগুনে গরম করা হয় ইস্ত্রি। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে এই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
বাবলু সাহা জানান, শুরুর দিকে প্রতি কাপড় ইস্ত্রি করতে নিতেন আট আনা, পরে এক টাকা। শাড়ি ইস্ত্রি করতেন ১০ টাকায়। তখন দিনে ২০ থেকে ৫০ টাকা আয় হতো। এখন কাপড়ের ধরন অনুযায়ী ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত নেন।

তিনি বলেন, “আগের দিনে আয় কম ছিল, কিন্তু সংসার ভালোই চলত। এখন বাজার বড় হয়েছে, মানুষ বেড়েছে, কাজও বেড়েছে। তবে জিনিসপত্রের দামও অনেক বেড়ে গেছে।”

বাবলু সাহার বাবা হরিপদ সাহা ও মা সুকুমারী রাণী আর বেঁচে নেই। ইস্ত্রির কাজ শুরু করার প্রায় তিন বছর পর তিনি বিয়ে করেন। সংসার জীবনে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। অল্প আয়ের সংসারে স্ত্রীও ছিলেন তার বড় সহযোদ্ধা। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে সংসারের খরচ সামলাতে স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন তিনি।

অভাবের ভেতরেও সঞ্চয়ের অভ্যাস ছাড়েননি বাবলু সাহা। সংসারের খরচ থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে প্রথমে কেনেন কিছু জমি। পরে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন কয়েক খণ্ড ধানিজমির মালিক। এখন সেই জমিতে নিজেদের উৎপাদিত ধানেই বছরের খাবারের বড় একটি অংশ চলে যায়।

তিনি বলেন, “প্রথমে একটু একটু করে জমি কিনেছি। পরে আবার কিছু সঞ্চয় করেছি। এখন কিছু ধানিজমি আছে। সেই জমির ধানেই বছরের খোরাকি হয়ে যায়।”

তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল অন্য জায়গায়। নিজের কষ্টের জীবনের ভেতরেও তিনি চেয়েছেন সন্তানদের শিক্ষিত করতে। বিশেষ করে ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন ছিল তার।

সবসময় প্রাণোচ্ছল এই মানুষটিকে স্থানীয়রা চেনেন সৎ, নিরীহ আর পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে। বাজারে বহু বছর ধরে কাজ করলেও কারও সঙ্গে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেননি—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার তরফদার বলেন, “মানুষটা খুবই সহজ-সরল। খুব সৎ আর কর্মঠ। কারও সঙ্গে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেননি। বাজারে অনেক ইস্ত্রির দোকান থাকলেও বাবলু সাহা প্রভাতের দোকানেই মানুষ বেশি কাপড় ইস্ত্রি করায়। শুধু বান্দাইখাড়া নয়, আশপাশের গ্রামের মানুষও তার কাছে আসে।”

জানা গেছে, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ইস্ত্রিটি খুব একটা নষ্টও হয়নি। শুধু একবার হাত থেকে পড়ে এর কাঠের হাতল ভেঙে গিয়েছিল। সেটিই একমাত্র বড় মেরামত। এরপর আর কোনো বড় সমস্যা হয়নি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে, বাজারে এসেছে আধুনিক যন্ত্রপাতি, জীবনযাত্রা হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু বাবলু সাহা প্রভাতের ছোট্ট দোকানে এখনও জ্বলছে কয়লার আগুন। সেই আগুনে শুধু কাপড়ই মসৃণ হয় না—সেখানে লুকিয়ে আছে এক সংগ্রামী মানুষের পরিশ্রম, সততা, সঞ্চয় আর আত্মমর্যাদার গল্প।

কয়লার ইস্ত্রির ভেতর জ্বলতে থাকা আগুন যেন এখনও বলে যায়—পরিশ্রম কখনো পুরোনো হয় না।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর