নাই টেলিফোন, নাই রে পিয়ন, নাই রে টেলিগ্রাম, বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম। গ্রাম বাংলার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম এখন প্রায়ই বিলুপ্তির পথে। ডাকঘর থাকলেও সে রকম আর নেই চিঠি পত্রের আসা যাওয়া। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহি আত্রাই উপজেলার একমাত্র বৃহত্তর ডাকঘরে প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে সেই দিনের পুরোনো দিনের গান গুলি চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও, চিঠি লিখেছে বউ আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে, একটা চিঠি দিলাম লিখে মনের কথা আজ তোমাকে –ইত্যাদি।
প্রিয়তমা, ভালোবাসা নিও…..তখন হলদে খামে ভরা সাদা কাগজে মোড়ানো চিঠিতে এভাবেই ভালোবাসার বাক্য বিনিময় হতো। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এমন আবেগের আমেজ একটু একটু করে দূরে গেছে। ডাকঘরের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে চিঠির জায়গা এখন অনলাইনের দখলে। কথাগুলো সবই উনিশ শতকের। প্রতিটি প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ের ডাক ছিল ‘চিঠি’। যে চিঠি আসত ডাকঘরে। আর খামেভরা কাগজের চিঠির জন্য মানুষ ডাকঘরের সামনে অপেক্ষা করত ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখন আসবে প্রিয়জনের চিঠি। চিঠি আসতে একটু দেরি হলে রানারের দুয়ারে ছুটত স্বজন কিংবা প্রিয়জন।
দিন পরিবর্তন হয়ে এখন রানারের দেখা মেলা ভার। কালেভদ্রে আসে দুয়েকটা চিঠি। যেখানে থাকে না আগের আওয়াজ আর আন্তরিকতা। এখন সেই ডাকবাক্সগুলোর আবেদন নেই। প্রিয়জনের চিঠির আশায় ডাকপিয়নের পথ চেয়ে থাকার দিনও ফুরিয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে ই-মেইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইমো ও ভাইবারসহ কত প্রযুক্তির সুবিধা আজ সবার জন্য অবারিত। শহরের তুলনায় পিছিয়ে নেই গ্রামও। গ্রামের মানুষের কাছে এখন এসব সুবিধা পৌঁছে গেছে।
এক সময়ের এই জনপ্রিয় ডাক বিভাগ এখন প্রায় নির্জিব হয়ে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। আত্রাই উপজেলার প্রধান ডাকঘরই ছিল এই জনপদের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম।উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে ডাকবিভাগ উপজেলায় বেশ কয়েকটি শাখা ডাকঘর স্থাপিত হয়। এ অঞ্চলে সাধারণ জনগণের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল এসব ডাকঘর।
জানা গেছে, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রসারের কারণে সেকালের ডাক বিভাগের প্রতি মানুষের এখন আর তেমন আগ্রহ নেই। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন জনগণ অতি দ্রুত দেশ-বিদেশের খবরাখবর আদান-প্রদান করতে পারছে। বর্তমানে বহুল প্রচলিত ইন্টারনেট, মোবাইল, ই-মেইল সহ বিভিন্ন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সবকিছু জানা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ডাক বিভাগের কার্যক্রম দিন দিন বিলুপ্তির পথে।
কালের বিবর্তনে ডাকঘরের গুরুত্ব হারিয়ে দিনের পর দিন তা জরাজীর্ণ হয়েছে। পড়ে আছে অবহেলায়। বিবর্ণ-হতশ্রী রূপ নিয়েছে গ্রাম-বাংলার ডাকবাক্সগুলো। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নিয়ে চলছে ডাক সেবার কার্যক্রম। বেশিরভাগ জায়গায়ই নেই ডাকঘর। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ ডাকঘর দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে। অনেক ডাকঘরে নেই কোনো ডাকবাক্স। দুয়েকটি থাকলেও তার মধ্যে চিঠির পরিবর্তে থাকছে বিড়ি, সিগারেটসহ ময়লা-আবর্জনা।
উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম সিংসাড়া ডাকঘরের লাল ডাকবাক্সটি থাকলেও এখানে আর চিঠি দেয়না কেউ । নিজস্ব ভবন না থাকায় ডাকঘরের কার্যক্রমও চলছে পোস্ট মাস্টারের বাড়ীতে।সিংসাড়া ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. আব্দুল লতিফ,জানান, বর্তমানে চিঠিপত্র জমাদানের ডাকবক্স থাকলেও নেই চিঠি পত্র আসা যাওয়া। সপ্তাহের ৩ দিনই সরকারি চিঠি এলেও আসে না ব্যক্তিগত চিঠি। উপজেলা সদরের ডাকঘর ছাড়া শাখা ডাকঘর ২৪ টি সাতটি ডাকঘরের নিজস্ব ভবন থাকলেও বাকি গুলোর নাজুক অবস্থা। তিনি আরো বলেন, আমাদের সে রকম বেতন নেই, শুধু সম্মানী ভাতা দেয় ৪০০০ টাকা। যাতে করে আমাদের সংসার চলে না, ফলে বাধ্য হয়ে অন্য কাজ করতে হয়।
গীতিকার, কবি ও সাহিত্যিক মো.সালেকুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তি আবেগকে হারিয়েছে। চিঠির যে সুগন্ধ তা হারিয়ে গেছে। প্রেয়সীর চিঠির ভেতর অনেক সময় গোলাপ ফুল আসত। এসবই এখন অতীত। মা ছেলের চিঠির জন্য জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত। চিঠি এখন সঙ্কুচিত হয়ে হয়েছে এসএমএস। এই গীতিকার ও কবির মতে, প্রযুক্তির বলাতে স্থায়িত্ব নেই। চিঠির বলার মধ্যে স্থায়িত্ব ছিল। কিছু চিঠি বই আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে।যা একসময় হয়তো সাহিত্য অঙ্গনে উদাহরণ হিসেবে ঠাঁই পাবে। ভালোবাসার চিঠিগুলোর নির্যাস একটু হলেও ধরে রাখতে চান তিনি।
উপজেলা পোস্ট মাষ্টার মো.জালাল উদ্দিন জানান, ডাকঘরকে ডিজিটাল করার জন্য অনেক প্রজেক্ট চলমান আছে। সরাসরি সুযোগ ভোগের জন্য বিভিন্ন এলাকায় কম্পিউটার, ই-মেইলের আওতায় আনা। ইন্টারনেট সম্পর্কিত সেবার বিস্তার করা। গ্রামাঞ্চলের সীমিত অনলাইন সুবিধাগুলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ইতোমধ্যে ডাক বিভাগের লেনদেন ডিজিটাল করার জন্য ‘নগদ’ কাজ করছে।
তিনি বলেন, অনেক মানুষই আসলে জানে না। তাদের ধারণা-চিঠিপত্র নাই তো ডাকঘরের প্রয়োজনীয়তা মনে হয় ফুরিয়ে গেছে। আসলে বাস্তবতা মানতে হবে সবাইকে। ব্যক্তিগত চিঠি আমরা কবে লিখেছি, কেউ স্মরণ করতে পারব না।চিঠি পত্র বর্তমানে দৈনিক ৫০টি পর্যন্ত আদান প্রদান হয়ে থাকে বলেও তিনি বলেন। তবে আগেকার আমলে প্রতিদিন কয়েকশত চিঠি এবং কয়েক লক্ষ টাকা আদান প্রদান হত। ডাক টিকেট, খাম বিক্রি হত প্রচুর। প্রতি মাসে রাজস্ব আদায় হত লাখ টাকা। এখন আর সেদিন নাই।পোস্ট অফিসে টাকা পাঠাতে ১ হাজার মাত্র ৫ টাকা খরচ। পাশাপাশি এখানে রয়েছে আরও অনেক সুবিধা ডাক জীবন বীমা। ১০, ১৫, ও ২০ বছর মেয়াদি।
তিনি আরও জানান উপজেলা ডাকঘরটি বৃটিশ আমলে হলেও ভবন নির্মিত হয় ১৯৮৩ সালে যার অবস্থা বর্তমানে জরাজীর্ণ।পরিত্যক্ত ভবনে চলছে ডাকঘরের যাবতীয় কাজ কর্ম। তবে পাশ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পোস্টমাস্টাররা আর্থিকভাবে অবহেলিত। অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, ডাক বিভাগকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালনা করা না হলে অচিরেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক ডাক সেবা।