মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বিশ্বমোড়ল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে—নৈতিকতার এই ভাষ্য অনেক ক্ষেত্রেই কেবল রাজনৈতিক মুখোশ। ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে লক্ষ্য করে কথিত অপহরণমূলক আগ্রাসী তৎপরতা সেই দ্বিচারিতার আরেকটি ভয়ংকর উদাহরণ।
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অন্য দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত নয়; বরং পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত। যদি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ভেঙে চুরমার করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে আসছে। এসব পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে—যার দায় কোনোভাবেই দেশটির জনগণের নয়। এখন যদি সেই চাপ আরও একধাপ এগিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণের মতো ঘটনায় রূপ নেয়, তবে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক সমাধান কখনোই স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। বরং এসব আগ্রাসন যুদ্ধ, অস্থিতিশীলতা ও মানবিক বিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করেছে। তাই ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থাকলেও তার সমাধান ভেনেজুয়েলার জনগণের মাধ্যমেই হওয়া উচিত, কোনো বিদেশি শক্তির বন্দুক বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)সহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক আইন যদি সত্যিই সবার জন্য সমান হয়, তবে অভিযুক্ত যেই হোক—তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় ‘মানবাধিকার’ শব্দটি কেবল শক্তিধরদের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হবে।
আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং একই সঙ্গে দাবি করি—এ ঘটনায় জড়িতদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক। বিশ্বব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হলে আজই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।