কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপকের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও একজনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতীম বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতীমের নিখোঁজের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। ফুটেজ বিশ্লেষণে পুলিশ দেখতে পায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
পরবর্তীতে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন পুলিশকে জানায়, অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে তাকে ওই এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও তার এক বন্ধুর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে তার বন্ধু কামরুলের সম্পৃক্ততার কথা জানায়। এরপর ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান অনুযায়ী তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বিকেল আনুমানিক ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে। এতে গুরুতর আহত হয়ে অপ্রতীমের মৃত্যু হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার সঙ্গে তার প্রকৃত সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন (সিএস) আদালতে দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। তিনি সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের বয়স ১৫ বছর। তিনি সদর দক্ষিণের সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা এবং ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে পুলিশ জানিয়েছে। কামরুল হাসান কুমিল্লা নগরীর হাতিগাড়া, কালিবাজার এলাকার বাসিন্দা। তার বয়স পুলিশ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া সিয়াম নামে ১৯ বছর বয়সী এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তিনি সদর দক্ষিণের এলাহীপুর এলাকার বাসিন্দা এবং কুমিল্লার দৌলতপুরের আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে।
নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ব্যবসায়ী এবং মোবাইল ফোন যন্ত্রাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তার মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পরবর্তীতে তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পুলিশ তার গতিবিধি শনাক্ত করে। ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশের একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তি জড়িত কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।