কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পূর্ববিরোধের জেরে একটি পরিবারের বসতবাড়িতে প্রকাশ্যে দিবালোকে হামলা চালিয়ে পুরো বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় পরিবারের সদস্যদের মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বাড়ির মালামাল লুটেরও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনার পর থানায় মামলা করতে গিয়ে হয়রানির অভিযোগ তুলে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিবারটি।
এ ঘটনায় রহিমা আক্তার (শিউলী) নামে এক নারী আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আকদিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আদালতে দায়ের করা অভিযোগে স্থানীয় সারোয়ার (৩৫), অহিদুর রহমান (৫৫), গিয়াস উদ্দিন (৫০), কাউসার (২৬), রাজিয়া আক্তার সুবর্ণা (৩৩), সাহাবুদ্দীন (৫৫), মীর হোসেন (৫৫), জয়নাল (৪৫), রবিন (২৪), হাসান (৩৫), কুদ্দুস (৫৫), আহাদ (২৬), জিহাদ (২৪) ও সাজু (৪০)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে অভিযুক্তরা বাড়িতে প্রবেশ করে বিভিন্ন মালামাল ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন এবং পরিবারের সদস্যদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেন। এ সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে কাফনের কাপড় দিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ করেছেন তারা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বাড়ির বিভিন্ন মালামাল ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি ৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৯০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে পরিবারের প্রায় ৮০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য নাসির আহাম্মদ বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে বশির গংদের কাছে বাড়ি ও জায়গা-জমি ২২ লাখ ৮ হাজার টাকায় বিক্রির জন্য চুক্তি করা হয়েছিল। সে সময় ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ৮ লাখ ৮ হাজার টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়নি। তার দাবি, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে ওই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।
নাসির আহাম্মদের অভিযোগ, এরপর থেকে প্রতিপক্ষ বিভিন্ন ভুয়া চুক্তিপত্র ও দলিল তৈরি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আসছে। স্থানীয়ভাবে সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য সাদা স্ট্যাম্পে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও পরে সেটিতে নিজেদের মতো করে লেখা ও প্রিন্ট করে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই তাদের বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পরও চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি। থানায় মামলা করতে সন্ধায় গেলে ওসি মামলা না নিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের রাত দুইটা পর্যন্ত বসিয়ে রেখে হয়রানি করেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বিবাদীপক্ষের কাউসার বলেন, জায়গা-জমিগুলো তারা ২০২৩ সালের শেষ দিকে ২৪ লাখ টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী পরিবারকে অন্যত্র জায়গা কিনে বাড়ি করার জন্য মানবিক কারণে তিন বছর সময় দেওয়া হয়েছিল।
কাউসারের দাবি, ‘এখন আমাদের বাড়ি আমরা ভেঙেছি।’ তবে তার দাবি অনুযায়ী তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কেন বসতবাড়ি ভেঙে ফেলা হলো—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। একইভাবে আদালত বা আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করা যায় কি না—এমন প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি তিনি।
কাউসার আরও জানান, বাড়িঘর ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে তিনি নিজে, সারোয়ার, মীর হোসেন, রবিন, হাসান ও জিহাদ নেতৃত্বে ছিলেন। ভাঙচুরের কাজে ৭-৮ জন রাজমিস্ত্রি নিয়োজিত ছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে ওই রাজমিস্ত্রিদের পরিচয় তিনি জানাননি।
ঘটনার বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোছাইনের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। উল্টো এ সময় ক্যামেরাম্যানকে ওসির কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ওসি আরিফ হোছাইন প্রতিবেদকের অনুমতি ছাড়াই নিজের মোবাইল ফোনে প্রতিবেদকের ভিডিও ধারণ শুরু করেন।
একপর্যায়ে ওসির কক্ষ ত্যাগের সময় প্রতিবেদকের কাছে ওসি জানতে চান- তার প্রতি কোনো কারণে অসন্তুষ্টি রয়েছে কি না প্রতিবেদক? কেন এমন প্রশ্ন করা হয়েছে জানতে চাইলে ওসি এ বিষয়ে আর কোনো উত্তর দেননি।
পরবর্তীতে ঘটনাটি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য নিতে চৌদ্দগ্রাম সার্কেলের কার্যালয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে বসতবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও পরিবারের নিরাপত্তার অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও আদালত বা আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে একটি বসতবাড়ি ভেঙে ফেলার অভিযোগ কতটা আইনসঙ্গত এবং ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা কী ছিল—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।