কুমিল্লায় মাদকবিরোধী বিশাল র্যালি ও সমাবেশ। মঞ্চে মন্ত্রী, পুলিশের ডিআইজি, এসপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ডিসি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে জেলার ১৮টি থানার ওসি, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মাঠজুড়ে স্কুলশিক্ষার্থী। স্লোগানে মুখর টাউন হল মাঠ।
কিন্তু এই আয়োজনের পরই সামনে এসেছে একাধিক প্রশ্ন মাদকবিরোধী আন্দোলন কি শুধু শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ড আর র্যালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ? মাদকের মূল উৎস, সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বিশেষায়িত সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরাই কেন উপস্থিত ছিলেন না?
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) কুমিল্লার টাউন হল মাঠে জেলা পুলিশের আয়োজনে মাদকবিরোধী র্যালি ও সমাবেশে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। এসময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ, জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু, জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম, জেলা সিভিল সার্জন ড. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক স্কুলশিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল মাদকবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
শিক্ষার্থীদের সচেতন করা মাদকবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাদক নিয়ন্ত্রণের মতো একটি জটিল সামাজিক ও অপরাধমূলক সমস্যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটি বড় কর্মসূচির মূল অংশগ্রহণকারী যদি হয় শুধু স্কুলশিক্ষার্থী, তাহলে মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিরোধ গড়ে উঠবে কীভাবে?
কারণ মাদকের সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক মাদকসেবী, মাদক কারবারি, সরবরাহকারী, পৃষ্ঠপোষক, সীমান্তপথ, পরিবহন নেটওয়ার্ক, অর্থের লেনদেন, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক সংকট ও জনস্বাস্থ্যের মতো বহু বিষয়।
এই আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি—মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কোথায়? মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের বিশেষায়িত সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অথচ কুমিল্লায় জেলার পুলিশ, প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এত বড় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাকে দৃশ্যমানভাবে দেখা যায়নি।
শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠেছে—এ কর্মসূচি সম্পর্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বা যোগাযোগও করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—মাদকবিরোধী কর্মসূচি আর মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থার মধ্যে যদি সমন্বয়ই না থাকে, তাহলে এই কর্মসূচি কতটা কার্যকর?
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক বজলুর রশিদ ডেইলি টাইমস নিউজকে বলেন, আমরা কোন দাওয়াত পাইনি। যেহেতু এটা একটি বড় প্রোগ্রাম, সেজন্য হয়তো সঙ্গত কারণে পুলিশ সুপার মহোদয় ব্যস্ততার কারণে ভুলে যেতে পারেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু পুলিশের অভিযাননির্ভর রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন কমিউনিটি পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ।
কিন্তু সম্প্রতি কুমিল্লায় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জেলা কমিটি গঠন নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাধান্য থাকলেও সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে—যে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরাই পর্যাপ্তভাবে যুক্ত নন, সেই আন্দোলন কি আদৌ কমিউনিটিভিত্তিক প্রতিরোধে রূপ নেবে?
পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ—তদন্ত কোথায়?
কুমিল্লায় মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এর মধ্যে মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যতা, জব্দকৃত মাদকের আলামত নিয়ে অনিয়ম এবং অর্থের বিনিময়ে আটক মাদক কারবারিদের ছেড়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য নয়, মাদকবিরোধী পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্যই গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করাও জরুরি।
কারণ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।
এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জেলা কমিটি ও মাদক বিরোধী সমাবেশে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ইশতিয়াক হাসান আমীন কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। তাহলে মাদকবিরোধী অভিযান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ, কিশোর অপরাধ দমন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—সবকিছুর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় কীভাবে করা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদককে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো কঠিন।
মাদকবিরোধী অভিযানে মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একই এলাকায় বারবার মাদক পাওয়া গেলে সেই মাদকের উৎস কোথায়? কারা সরবরাহ করছে? কারা অর্থায়ন করছে? কারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে? শুধু খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে যদি মূল চক্র অক্ষত থাকে, তাহলে মাদক ব্যবসা বন্ধ হবে না।
তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, অর্থের উৎস অনুসন্ধান, সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্ত, পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কি আধুনিকায়ন হবে?
মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত সংস্থাটির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম কতটা সফল হবে—এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে কি সত্যিই যুগোপযোগী ও আধুনিক করা হবে, নাকি বছরের পর বছর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ চালিয়ে যাবে?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের জেলা কমিটি গঠনের বিষয়ে আমি অবগত নই। মাদকবিরোধী র্যালি ও সমাবেশে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা হলে কর্মসূচিটি আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতো।
মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে চিকিৎসকরা আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে পারেন, আইনজীবীরা আইনি সহায়তা দিতে পারেন এবং মানবাধিকারকর্মীরা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
তাহলে এসব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি স্থায়ী মাদকবিরোধী সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম কেন গড়ে তোলা হচ্ছে না—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
জেলা পুলিশের আয়োজনে র্যালি হলেও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ ডেইলি টাইমস নিউজকে বলেন, টাউনহল মাঠে আয়োজিত র্যালি ও সমাবেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপস্থিতির বিষয়ে আমি জানি না। জেলা কমিটির কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সমন্বয়হীনতা যদি হয়ে থাকে, এটা হবে না। আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করবো। একটু ভুলত্রুটি বের হলো, পরবর্তীতে এগুলো ঠিক হয়ে যাবে।”
শিক্ষার্থীদের হাতে প্ল্যাকার্ড দিয়ে মাদককে ‘না’ বলানো নিঃসন্দেহে সচেতনতার বার্তা দেয়। কিন্তু একটি র্যালি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি কার্যক্রমও শেষ হয়ে যায়, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিরোধ কতটা তৈরি হবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সাফল্য মাপতে হলে দেখতে হবে— মাদকের উৎস বন্ধ হয়েছে কি না, সরবরাহকারী চক্র ভেঙেছে কি না, পৃষ্ঠপোষকরা আইনের আওতায় এসেছে কি না, আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন হচ্ছে কি না এবং সাধারণ মানুষ মাদকবিরোধী সামাজিক নজরদারিতে যুক্ত হয়েছে কি না। কুমিল্লার মানুষ তাই এখন র্যালির ছবি নয়, দেখতে চায় মাদকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ফলাফল।
এক দিনের সমাবেশে হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো করা সহজ। কিন্তু মাদকের মূল চক্র ভেঙে দেওয়া, পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং একটি কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা।
তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কুমিল্লার মাদকবিরোধী এই আয়োজন কি শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক র্যালি, নাকি এর পর শুরু হবে সত্যিকারের মাদকবিরোধী অভিযান?