ভাগ্য ফেরাতে ভিটেমাটি বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১২ যুবক। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি তাদের পরিবার। রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধা। প্রিয় সন্তান ও স্বজনদের হারিয়ে আত্রাই উপজেলার শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোতে এখন চলছে আহাজারি ও শোকের মাতম।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে আগুনে পুড়ে বাংলাদেশি ১৬ শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২ জনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা।
সোমবার সকালে আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধুই বিষাদের ছায়া। এই গ্রামেরই চার তরুণ—মোহন, সুমন, রেজোয়ান ও ফারুক—পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তের মধ্যেই ছাই হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন ও পরিবারের প্রত্যাশা।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে নিহত মোহন ও সুমনের বাড়িতে। একই দুর্ঘটনায় দুই সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তাদের মা-বাবা। দেশে ফিরে নতুন ঘর তুলবেন—এমন স্বপ্নে সৌদি আরবে যাওয়ার আগে বাড়ির সামনে নতুন ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই নতুন ঘরে আর ফেরা হলো না দুই ভাইয়ের।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নিহতদের মা ময়না বিবি বলেন, “আমার ছেলেদের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখতে চাই।”
একই গ্রামের নিহত রেজোয়ানের মা কারিমা বেগম বাড়ির সামনে বিলাপ করছিলেন। পাশে বসে কাঁদছিলেন তাঁর বোন। পরিবারের সদস্যরা জানান, দেশে ফিরে রেজোয়ানের বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কেবলই স্মৃতি।
গন্ডগোহালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদ বলেন, “একই গ্রামের চারজন উদীয়মান যুবককে এভাবে হারিয়ে পুরো গ্রাম আজ স্তব্ধ। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।”
উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ও শেষ সম্বল হারিয়ে পরিবারগুলো এখন নিঃস্ব। স্বজনদের একটাই চাওয়া—অন্তত শেষবারের মতো প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখতে চান তারা এবং নিজ মাটিতে তাদের দাফন করতে চান।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলার একজন, আত্রাই উপজেলার ১২ জন, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুজন এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার একজন রয়েছেন।
মর্মান্তিক এই ঘটনার খবর পেয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনরুজ্জামান বলেন, “আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
স্বজন হারানোর বেদনায় আত্রাইয়ের গ্রামগুলোতে এখন কেবলই কান্নার রোল। প্রবাসে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এসব তরুণের নিথর দেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্বজনরা।