কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির শিকদারকে ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককেন্দ্রিক ব্যাপক অনিয়ম, মাসোহারা আদায় এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, একাধিক সূত্রের বক্তব্য এবং প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে মহাসড়কের বিভিন্ন বৈধ ও অবৈধ খাত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি সুসংগঠিত চক্রের অস্তিত্বের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া থানায় ওসি জাকির শিকদারের যোগদানের পর মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহন উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাসড়কে বালুবাহী ট্রাক্টর চলাচল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার আওতাধীন এলাকায় এসব যানবাহন নিয়মিত চলাচল করে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কালাম নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এসব ট্রাক্টর থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই খাত থেকেই প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আদায় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে ট্রাক্টরগুলোকে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়।
একইভাবে মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা কয়েকটি স-মিলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দখল করে কাঠ রাখার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট তিনটি স-মিল থেকে নিয়মিত মাসিক ৯ হাজার টাকা অর্থ নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইন প্রয়োগের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন ট্রাক ও পিকআপ থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শুধু এই খাত থেকেই মাসিক প্রায় ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ও শাসনগাছা এলাকা থেকে ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে সড়ক ব্যবহারকারী বিভিন্ন পরিবহন থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একতা পরিবহন ও সততা পরিবহন থেকে মাসিক ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্র আরও জানিয়েছে, ফিটনেসবিহীন, জরাজীর্ণ ও বিভিন্ন ত্রুটিযুক্ত যানবাহন মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ পেতে একটি কথিত ‘টোকেন পদ্ধতি’র আওতায় চলে। পিন্টু নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এ খাত থেকে মাসিক প্রায় ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশা থেকেও হানিফ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব খাত ছাড়াও আরও বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থের একটি অংশ থানা পরিচালনা, সোর্স খরচ এবং বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করার কাজে ব্যয় করা হলেও বাকি অর্থ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মুঠোফোনে প্রাথমিকভাবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে দুই দিন পর তিনি নিজেই হোয়াটসঅ্যাপে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে থানায় আসার অনুরোধ জানান।
পরবর্তীতে বুধবার (১০ জুন) বিকেলে এই প্রতিবেদক ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানায় গেলে ওসির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে মহাসড়কের বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয় উঠে আসে। এতে ওই আলোচনায় ওসি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বিষয়টি সংবাদ আকারে প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু অনুরোধেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ওসি জাকির শিকদার। সংবাদটি প্রকাশ না করার বিনিময়ে প্রতিবেদককে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবের পাশাপাশি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যা ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি থানার অনিয়ম নয়, বরং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম বলেন, যদি এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
অন্যদিকে একই বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও ডিআইজি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
(এটি একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন। মহাসড়কে ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে)